যুবকদের ডায়াবেটিস, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস ও পিসিওএস: ত্রিমুখী জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ

যুবকদের ডায়াবেটিস, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস ও পিসিওএস: ত্রিমুখী জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ

বাংলাদেশে ১০ থেকে ৩৪ বছর বয়সী তরুণ-যুবকদের মধ্যে ‌'টাইপ টু' ডায়াবেটিসে আক্রান্তের হার ৪.৫ ভাগ, প্রি-ডায়াবেটিসের হার ১৮.৪ ভাগ। এদের ৬৬.৩ ভাগ শনাক্তের বাইরে। ১৮ ভাগ নারী গর্ভকালীন ডায়াবেটিস এবং ২.৭ ভাগ গর্ভাবস্থায় প্রথম শনাক্ত ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। প্রায় প্রতি পাঁচজন গর্ভবতী নারীর একজন হাইপারগ্লাইসেমিয়ায় আক্রান্ত। অন্যদিকে ১০ থেকে ৪৫ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমে (পিসিওএস) আক্রান্তের হার ৬.৯ ভাগ। 

দেশে পরিচালিত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় গবেষণার ফলাফলে এমনই চিত্র উঠে এসেছে। আজ শনিবার (১১ এপ্রিল) ঢাকা ক্লাবে আয়োজিত এক বৈজ্ঞানিক ডিসেমিনেশন (প্রচার) কার্যক্রমে গণমাধ্যম, চিকিৎসক, গবেষক এবং নীতিনির্ধারকদের সামনে এসব গবেষণার ফলাফল তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে স্টাডি অন ওবেসিটি অ্যান্ড ডায়াবেটিস ইন ইয়ং গ্রুপ, পিসিওএস স্টাডি গ্রুপ, জিডিএম স্টাডি গ্রুপ এবং বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ। সায়েন্টিফিক পার্টনার ছিল অ্যাডভান্স কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ।

বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ডা. এম এ হাসানাতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য প্রফেসর ডা. এফ. এম. সিদ্দিকী। বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসমীম, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (হাসপাতাল) মো. রুহুল আমিন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর ডা. ফরিদ উদ্দিন।

তরুণদের মধ্যে ডায়াবেটিস উদ্বেগজনক:
'বাংলাদেশে যুব বয়সে টাইপ টু ডায়াবেটিস: জাতীয় প্রাদুর্ভাব ও ঝুঁকির কারণ' শীর্ষক গবেষণাটি উপস্থাপন করেন সহযোগী অধ্যাপক ডা. মাশফিকুল হাসান। গবেষণাটি দেশের ৮টি বিভাগের ২ হাজার ৩শ তরুণ-তরুণীর ওপর পরিচালিত হয়। এই গবেষণায় দেখা যায়, ১০ থেকে ৩৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে টাইপ টু ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যা ৪.৫ ভাগ এবং প্রি-ডায়াবেটিসে ভুগছে ১৮.৪ ভাগ। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আক্রান্তদের মধ্যে ৬৬.৩ ভাগের আগে কখনও ডায়ােবেটিস শনাক্তই হয়নি। এতে আরও দেখা যায়, ডায়াবেটিসের হার কিশোরদের তুলনায় তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে বেশি (৭.৫ ভাগ বনাম ১.৩ ভাগ) এবং গ্রামের তুলনায় শহরে বেশি (৬.০ ভাগ বনাম ৩.২ ভাগ)।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর মূল কারণ কম শারীরিক পরিশ্রম, তামাক ব্যবহার, স্থূলতা বা ওজন বেশি হওয়া, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বৃদ্ধি ইত্যাদি। এই গবেষণায় তরুণদের মধ্যে আগেভাগে ডায়াবেটিস শনাক্তকরণ এবং জীবনধারাভিত্তিক প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।

পিসিওএস একটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি:
'বাংলাদেশি নারীদের মধ্যে পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম বা পিসিওএস এর প্রাদুর্ভাব' শীর্ষক গবেষণাটি উপস্থাপন করেন সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. শাহেদ মোরশেদ। এতে দেখা যায়, ১০ থেকে ৪৫ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে পিসিওএস এ আক্রান্তের হার ৬.৯ ভাগ। প্রাপ্তবয়স্ক রোগীদের মধ্যে মেটাবলিক সিনড্রোম কিশোরীদের তুলনায় অনেক বেশি ছিল (৩৩.৩ ভাগ বনাম ৪.০ ভাগ)।

গবেষণায় অংশ নেওয়া ৭৯৮ জন নারীর মধ্যে ৪.৮ ভাগ অনিয়মিত মাসিক ও অবাঞ্ছিত লোম—উভয় সমস্যায় ভুগছিলেন। ৯.৪ ভাগ নারীর শুধু অবাঞ্ছিত লোম এবং ১৭.৭ ভাগের শুধু অনিয়মিত মাসিক ছিল।  
গবেষকরা জানান, পিসিওএস এ আক্রান্ত নারীদের মধ্যে বংশগত প্রবণতা, ঘুমের সমস্যা, হরমোনজনিত বৈশিষ্ট্য এবং বিপাকীয় জটিলতা বেশি দেখা যায়। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মেটাবলিক সিনড্রোমের হার কিশোরীদের তুলনায় অনেক বেশি।

পাঁচজন গর্ভবতীর একজন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত:
'বাংলাদেশে গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের জাতীয় চিত্র' শীর্ষক অন্য গবেষণাটি উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ডা. তানিয়া তোফায়েল। দেশের ৮টি বিভাগের ১ হাজার ১৯৪ জন গর্ভবতী নারীর ওপর এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, ২০.৭ ভাগ নারীর গর্ভধারণে ডায়াবেটিস ছিল। এর মধ্যে ১৮.০ ভাগ গর্ভকালীন ডায়াবেটিস এবং ২.৭ ভাগ গর্ভাবস্থায় প্রথম শনাক্ত ডায়াবেটিস। অর্থাৎ, দেশে প্রায় প্রতি পাঁচজন গর্ভবতী নারীর একজন হাইপারগ্লাইসেমিয়ায় আক্রান্ত।
এই গবেষণায় সবার ক্ষেত্রে ৭৫ গ্রাম ওরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট (ওজিটিটি) করা হয়। গবেষকদের মতে, এ ফলাফল গর্ভাবস্থায় নিয়মিত ও মানসম্মত স্ক্রিনিং চালুর প্রয়োজনীয়তা জোরালোভাবে তুলে ধরে।
বিশেষজ্ঞরা গর্ভাবস্থায় সবার জন্য নিয়মিত ও মানসম্মত স্ক্রিনিং চালুর প্রয়োজনীয়তার কথা জোরালোভাবে তুলে ধরেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ:
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ডায়াবেটিস ও প্রি-ডায়াবেটিসের দ্রুত বিস্তার, গর্ভবতী নারীদের উচ্চ হারে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস এবং প্রজননক্ষম নারীদের মধ্যে পিসিওএস-এর উপস্থিতি—সব মিলিয়ে একটি বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

গবেষকরা প্রাথমিক পর্যায়ে স্ক্রিনিং জোরদার, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, জীবনধারাভিত্তিক প্রতিরোধ এবং নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবায় এন্ডোক্রাইন কেয়ারকে আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এসব রোগ দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে।

 

বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসে গ্রিনমাইন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে 'ফ্রি ডেন্টাল চেকআপ' ক্যাম্প অনুষ্ঠিত পরবর্তী

বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসে গ্রিনমাইন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে 'ফ্রি ডেন্টাল চেকআপ' ক্যাম্প অনুষ্ঠিত

কমেন্ট